ঢাকা খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
ফিচার

ঈদ: ফিরে আসার অনন্ত গল্প-কৃষিবিদ মোঃ আতিকুর রহমান

আতিকুর রহমান ১৮ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৩ পি.এম

ঈদ মানেই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; ঈদ মানে ফিরে আসা। শেকড়ের টানে, মায়ার ডাকে, ভালোবাসার আকর্ষণে মানুষ যখন দূরত্ব ভেঙে ঘরে ফেরে-সেই প্রতিটি পদচারণায় লুকিয়ে থাকে একেকটি গল্প, একেকটি অনুভব, একেকটি জীবনের দীর্ঘশ্বাস মিশ্রিত আনন্দ।

বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য ঈদ যেন এক অদ্ভুত আকুলতা। সারা বছর হলের নির্জন কক্ষ, ব্যস্ত ক্যাম্পাস আর ক্লাস-পরীক্ষার চাপে থাকা এই তরুণেরা ঈদের ছুটিতে যখন বাড়ির পথে রওনা হয়, তখন তাদের চোখে ভাসে মায়ের মুখ, বাবার অপেক্ষা, ছোট ভাইবোনের উচ্ছ্বাস। বাসের ভিড়, ট্রেনের দীর্ঘ লাইন, অনিশ্চিত যাত্রা সবকিছুই সহনীয় হয়ে ওঠে একটি বাক্যের জন্য: “বাড়ি ফিরছি।” সেই ফেরার পথেই তারা যেন আবার নতুন করে খুঁজে পায় নিজেদের অস্তিত্ব, নিজেদের শেকড়।

বিদেশ থেকে যারা পড়াশোনা করতে আসে বা প্রবাসে জীবন গড়ে তোলে, তাদের জন্য ঈদ আরও গভীর এক অনুভূতি। দূর আকাশের নিচে থেকেও তারা খুঁজে ফেরে নিজের মাটির গন্ধ। বছরের পর বছর অপেক্ষা, ছুটির হিসাব, টিকিটের দুশ্চিন্তা সবকিছুর শেষে যখন তারা দেশে ফেরে, তখন সেই মাটিতে পা রাখার মুহূর্তটাই হয়ে ওঠে এক অনির্বচনীয় সুখের উপলব্ধি। যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া একটি অংশ আবার ফিরে পাওয়া।

চাকরিজীবী মানুষের ঈদও কম সংগ্রামের নয়। ছুটির জন্য আবেদন, কাজের চাপ সামলে নেওয়া, শেষ মুহূর্তের দৌড়ঝাঁপ সবকিছু পেরিয়ে যখন তারা শহর ছাড়ে, তখন যেন বুক ভরে ওঠে এক অদ্ভুত স্বস্তিতে। এই শহরের কোলাহল, ক্লান্তি, প্রতিযোগিতা থেকে দূরে গিয়ে তারা ফিরে পায় এক টুকরো শান্তি যেখানে অপেক্ষা করে থাকে পরিবারের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

প্রবাসীদের গল্প আরও বেশি আবেগময়। রুটি-রুজির তাগিদে যারা হাজার মাইল দূরে থাকে, তাদের জন্য প্রতিটি ঈদই এক ধরনের অসম্পূর্ণতা বয়ে আনে। তবুও যারা ফিরতে পারে, তাদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে অনির্বচনীয় আনন্দ। বিমানবন্দরের সেই প্রতীক্ষা, সন্তানের লাজুক হাসি, মায়ের অশ্রুসিক্ত আলিঙ্গন—সব মিলিয়ে যেন সময় থমকে দাঁড়ায়। আর যারা ফিরতে পারে না, তাদের জন্য ঈদ হয়ে ওঠে স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকার এক দিন ভিডিও কলে দেখা হাসি, দূরত্বে আটকে থাকা ভালোবাসা।

ঈদের এই ফিরে আসার গল্পের আরেকটি উজ্জ্বল দিক হলো বন্ধুত্বের পুনর্মিলন। নিজের এলাকার প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ যেন এক আনন্দমুখর মিলনমেলা। বছরের পর বছর যার সঙ্গে কথা হয় না, সেই বন্ধুও হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায় একটি হাসি, একটি আলিঙ্গন, আর অগণিত স্মৃতির ঝাঁপি খুলে যায় মুহূর্তেই। গ্রামের পথ, স্কুলের মাঠ, শৈশবের গল্প সবকিছু যেন আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।

তবে এই মিলনের মাঝেও লুকিয়ে থাকে বিচ্ছেদের হালকা ব্যথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, কিংবা কর্মস্থলের সহকর্মীরা যাদের সাথে প্রতিদিনের জীবন জড়িয়ে থাকে, ঈদের সময় তাদের থেকে কিছুদিন দূরে থাকতে হয়। নিয়মিত আড্ডা, একসাথে চা খাওয়া, ক্লাস শেষে কিংবা অফিস শেষে গল্প এসব হঠাৎ থেমে গেলে মনে এক ধরনের শূন্যতা জন্ম নেয়। এই দূরত্ব কখনো প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, আবার কখনো নীরব কষ্টের নাম।

ঈদ মানেই শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ব্যবসায়ীদের জন্য এটি এক সুবর্ণ সময়। নতুন পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, উপহার সবকিছুর বাজার জমে ওঠে উৎসবকে ঘিরে। দোকানপাটে উপচে পড়া ভিড়, মানুষের উচ্ছ্বাস সব মিলিয়ে এক প্রাণচঞ্চল পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু এই বাণিজ্যের পেছনেও থাকে এক মানবিক গল্প প্রিয়জনকে খুশি করার ইচ্ছা, সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা।

ঈদের আনন্দকে আরও গভীর করে তোলে উপহার আর ঈদীর ছোট ছোট আয়োজন। পরিবারের ছোট সদস্যদের চোখে থাকে নতুন টাকার স্বপ্ন, বড়দের মনে থাকে ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা। নতুন জামার ঘ্রাণ, নতুন টাকার খসখসে স্পর্শ এই ছোট ছোট অনুভূতিগুলোই ঈদকে করে তোলে হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের উৎসব।

ঈদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবিকতা ও ভাগাভাগির শিক্ষা। এই সময় ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে সবাই একসাথে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করে। যাদের জীবনে অভাব আছে, তাদের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত। এক প্লেট সেমাই ভাগ করে নেওয়া, একটি নতুন জামা তুলে দেওয়া এই ছোট ছোট কাজগুলোই সমাজে ভালোবাসার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।

ঈদ তাই কেবল উৎসব নয়, এটি এক আবেগের সেতুবন্ধন যেখানে ফিরে আসা, মিলন, বিচ্ছেদ, ভালোবাসা, স্মৃতি আর মানবিকতা একসূত্রে গাঁথা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যত দূরেই যাই না কেন, যত ব্যস্তই হয়ে পড়ি না কেন, আমাদের একটি ঠিকানা সবসময় থাকে, যেখানে আমরা ফিরে যেতে পারি। সেই ঠিকানার নাম “বাড়ি”।

ঈদ আসে, মানুষ ফিরে আসে, স্মৃতি জাগে, ভালোবাসা নবায়ন হয়। আর এই অসংখ্য ফিরে আসার গল্প, মিলনের গল্প, অপেক্ষা আর না-পাওয়ার গল্প মিলেই তৈরি হয় আমাদের সমাজের এক অনন্ত আবেগময় কাব্য—যার নাম ঈদ।

কৃষিবিদ মোঃ আতিকুর রহমান আহ্বায়ক,বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল এবং শিক্ষার্থী,মাস্টার্স ২য় সেমিস্টার, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ।

এই সম্পর্কিত আরও খবর

আরও খবর

news image

ঈদ: ফিরে আসার অনন্ত গল্প-কৃষিবিদ মোঃ আতিকুর রহমান

news image

ভাষা আন্দোলন ও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের প্রয়োজনীয়তা

news image

সাতক্ষীরায় লবণাক্ততা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়াতে আগাম বোরো চাষ করছে কৃষক

news image

যাদের স্বামী পাশে থেকেও নেই তাদের করনীয়

news image

মাঘের শীতেই মুকুলে ভরেছে দিনাজপুরের আমগাছ

news image

বিলুপ্তির পথে দিনাজপুরের শীতল মাটির ঘর

news image

বাংলাদেশের আকাশছোঁয়া জলবায়ু ঋণ: সহনশীলতা ঝুঁকিতে, দারিদ্র্য বাড়ছে

news image

সর্বজনীন ফর্মূলায় না আসলে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে বাংলাদেশ

news image

দূষিত পরিবেশে বিপন্ন দেশ রক্ষার এখনই সময়

news image

আম ব্যবসায় সাফল্য: বড় উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন সোহাগের 

news image

তামাকমুক্ত দেশ গড়তে সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন

news image

সৌখিন কৃষি ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানবিক সেবা কাজে কুসুমপুর গ্রামবাসীর ভালোবাসায় শিক্ত ভেষজ বিজ্ঞানী বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ টিপু সুলতান পিএইচডি 

news image

প্রযুক্তিগত সুফল কৃষিতে জাগরণ সৃষ্টি করেছে

news image

পথে প্রান্তরে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে জারুল ফুল

news image

হাওরে কান্দা কাটায় গোখাদ্য ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস

news image

দক্ষিনাঞ্চল থেকে হাড়িয়ে যাচ্ছে ফুটপাতে চুলকাটার ঐতিহ্য

news image

জোসেফ মাহতাবের এক বহুমুখী সমাজ সংস্কারকের অন্যতম গল্প

news image

শেরপুরের মাটি সূর্যমুখী চাষে বেশ উপযোগী

news image

আমতলীতে আমের মুকুলের মৌমৌ গন্ধে দল বেঁধে মধু আহরনে ছুটছে মৌমাছি

news image

আমতলী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বেত ও বেতফল

news image

ভবেন্দ্র মোহন সাহা থেকে ভবা পাগলা হয়ে উঠার গল্প

news image

দক্ষিনাঞ্চল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গানের পাখি দোয়েল