অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে নি:স্ব হচ্ছে একাধিক পরিবার। জুয়ার ভয়াল থাবায় ভেঙে যাচ্ছে অনেকের সোনার সংসার। জুয়ায় আসক্ত হয়ে ভালোবাসাও কমে যাচ্ছে পরিবার স্ত্রী সন্তানের প্রতিও। কেউ কেউ নিয়েছে সেফারেশনের সিদ্ধান্ত। ইতিমধ্যে অনেকে হাড়িয়েছেন চাকুরি ব্যবসা। অনলাইন জুয়ার কারনে সমাজে বেড়েছে নানা ধরনের অপরাধ। চুরি,ছিনতাই,নেশায় আসক্তি এমনকি হত্যার মত অপরাধও সংগঠিত হচ্ছে অনলাইন জুয়াকে কেন্দ্র করে। যারা জুয়ায় আসক্ত তারা নি:স্ব হলেও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে এজেন্ট বা বিডাররা।
সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়াকে কেন্দ্র করে মুক্তাগাছার মাদ্রাসার ছাত্র ফুটফুটে শিশু রাফিকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে। এরপর তার নিথর দেহ বস্তাবন্দী করে বাবা-মায়ের ঘরের কাছের সেফটি ট্যাংকে ফেলে রাখা হয়েছিল। যেন বাবা-মা নিজেদের বুকের ধন সন্তানের লাশ দেখে কলিজা ফেটে আহাজারি করে, হৃদয় ভেঙে স্তব্ধ হয়ে যায়। নৃশংসতার নেপথ্যে ভয়াল অনলাইন জুয়ার বাণিজ্যের কুফল নিয়ে এখন জনমনে তীব্র আলোচনা। এ ঘটনা শুধু একটি হত্যাকান্ড নয়; এটি পুরো মানবিকতা, নিরাপত্তাবোধ ও সামাজিক বিবেকের ওপর নির্মম আঘাত। একটি নিষ্পাপ শিশুর নিথর দেহ যেন পুরো সমাজকে প্রশ্ন করেছে আমরা কোথায় যাচ্ছি?
গত কয়েক মাসে বিভিন্ন পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও “মুক্তাগাছা হেল্পলাইন”- সহ বিভিন্ন গ্রুপে হারানো বিজ্ঞপ্তিতে একের পর এক শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। কিন্তু সেই শিশুদের সবাই কি ফিরে এসেছে? তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে সেই প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর সাধারণ মানুষের কাছে নেই। ফলে জনমনে উদ্বেগ, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ময়মনসিংহের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতি স্থানীয় অনেকের কাছেই নজিরবিহীন বলে মনে হচ্ছে।
রাফি হত্যাকে কেবল ব্যক্তিগত বিরোধের বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সমাজের ভেতরে ভয়াবহভাবে বিস্তার লাভ করা অনলাইন জুয়ার অন্ধকার জাল আজ গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। প্রথমে মোবাইল গেমের ছদ্মবেশ, এরপর আসক্তি, তারপর টাকার লেনদেন এই ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠছে ভয়ংকর অপরাধচক্র। এই জুয়া শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করছে না; এটি যুবসমাজের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও ধ্বংস করছে।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা,ফুলপুর, হালুয়াঘাট, ত্রিশাল,ফুলবাড়িয়া সহ বিভিন্ন এলাকার অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতা এতটাই বেড়েছে যে বিষয়টি জাতীয় সংসদেও উত্থাপিত হয়েছিল। জনপ্রতিনিধির পক্ষ থেকে প্রতিকার চাওয়া হলেও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এরপর কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়?
যেহেতু মুক্তাগাছার জনপ্রতিনিধি এমপি জাকির হোসেন বাবলু নিজেই এই অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতার কথা স্বীকার করেছেন, তাই জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এটি নির্মূলে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্বও তার। মানুষ তখনই প্রশাসনের পাশে দাঁড়াবে, যখন তারা আইনের নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগ দেখতে পাবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন কিংবা স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ এখনো মানুষের চোখে পড়েনি। ফলে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে এই ভয়ংকর আন্ডারওয়ার্ল্ড চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে এত নীরবতা কেন?
এ বিষয়ে সচেতন নাগরিক মো. রাসেল আহমেদ বলেন, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান কঠোর উদ্যোগের অভাব জনমনে হতাশা তৈরি করেছে। অপরাধীরা যদি প্রকাশ্যে সক্রিয় থাকে এবং মানুষ যদি আইনের কার্যকর প্রয়োগ দেখতে না পায়, তাহলে প্রশাসনের প্রতি আস্থা দুর্বল হওয়াই স্বাভাবিক। এই অনলাইন জুয়ার ভয়াবহ প্রভাবের বাস্তব উদাহরণ স্থানীয় সমাজেও রয়েছে বলে আলোচনা আছে। শতশত পরিবার আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এই চক্র পরিচালনার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে ভেনডার বা হোস্ট ব্যবস্থাও কাজ করে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা বিষয়টিকে আরও সংগঠিত অপরাধের রূপ দিচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু ক্ষেত্রে অনলাইন জুয়ার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আড়াল করে সংবাদ প্রকাশের অভিযোগও উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন, তবুও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক সত্য গোপন করে কি সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব?
তিনি আরও বলেন,এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অভিভাবকদের। সন্তান মোবাইলে কী করছে, কোন গেম খেলছে, কার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এসব বিষয়ে সচেতন নজরদারি এখন সময়ের দাবি। কারণ অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হচ্ছে, আর সেই টাকার পেছনে জন্ম নিচ্ছে অপরাধ, সহিংসতা ও সামাজিক অবক্ষয়।
এ বিষয়ে সমাজকর্মি ও সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, অনলাইন জুয়ার কালোথাবা আজ সমাজের সর্বত্র। বিভিন্ন বয়সের ও শ্রেণী-পেশার মানুষ অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজের উপর। অধিকন্তু, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি হত্যাকান্ড এর সাক্ষ বহন করছে। অনলাইন জুয়া বন্ধ করতে আমাদের আইনশৃঙ্খলাবাহিনী তেমন তৎপর নয় এবং অনলাইন জুয়ার বিভিন্ন সাইট বন্ধ করতে কার্যকরী ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। যুগের সাথে পাল্লা দিয়ে অপরাধের ধরণ পাল্টাচ্ছে। তাই আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে ডিজিটাল অপরাধ দমনে সক্ষমতা অর্জন করে অনলাইন জুয়া বন্ধে অধিকতর তৎপর হওয়া একান্ত জরুরি।
জাতিসংঘের শিক্ষা সংস্থার কর্মকর্তা ও মুক্তাগাছার সচেতন নাগরিক মোহাম্মদ সাজাদুল করিম জানান, নিষ্পাপ রাফিকে গলাটিপে হত্যা মানে শুধু একটি শিশুকে হত্যা নয়; এটি মুক্তাগাছার অগণিত বাবা-মায়ের বুকের আর্তনাদকে গলাটিপে দমিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা। অনলাইনে জুয়ার বিরুদ্ধে সরব হওয়া মুখকে স্তব্দ করে দেওয়ার হীন প্রচেষ্টা। আজ যদি এই সামাজিক ব্যাধিকে প্রতিহত করা না যায়, তাহলে আগামীকাল এই অন্ধকার আপনার-আমার ঘরেও পৌঁছে যেতে পারে। এখনই সময় জেগে ওঠার। এখনই সময় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার। জুয়া নির্মূল হোক,ময়মনসিংহ নিরাপদ হোক, শিশুরা ফিরে পাক নিরাপদ শৈশব।
ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রশাসন ও অর্থ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ময়মনসিংহে মাদক নির্মূলে জেলা পুলিশ, ডিবি পুলিশ, থানা পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে মাদকবিরোধী অভিযানে সাফল্যের জন্য ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সারাদেশে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। বর্তমানে পরিচালিত প্রধান কার্যক্রমগুলো হলো নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক উদ্ধার। মাদক ব্যবসায়ী, পরিবহনকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের গ্রেফতার এবং তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের। মহাসড়ক, বাসস্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট স্থাপন করে তল্লাশি অভিযান পরিচালনা। জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও থানার সোর্স নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গোপন তথ্য সংগ্রহ ও টার্গেটেড অভিযান। সীমান্ত ও আন্তঃজেলা রুট ব্যবহারকারী চক্র শনাক্তে নজরদারি বৃদ্ধি। মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সচেতনতামূলক সভা, উঠান বৈঠক ও প্রচারণা। ওয়ারেন্টভুক্ত ও পলাতক মাদক মামলার আসামিদের গ্রেফতারে বিশেষ টিম গঠন। মাদক বিক্রির অর্থ ও সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং আর্থিক নেটওয়ার্ক চিহ্নিতকরণ। র্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যৌথ অভিযান পরিচালনা। সম্প্রতি বিভিন্ন অভিযানে হাজার হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট, বিপুল পরিমাণ গাঁজা ও অন্যান্য মাদক উদ্ধার এবং সহস্রাধিক মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের অভিযানে বছরের প্রথম কয়েক মাসেই কয়েক কোটি টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে এবং “জিরো টলারেন্স” নীতিতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অনলাইন জুয়া নির্মূলেও আমাদেও কাজ চলমান রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান নিষ্পাপ রাফির মৃত্যু যেন আরেকটি সংবাদ শিরোনাম হয়ে হারিয়ে না যায়। এই আর্তনাদ প্রতিটি ঘরে পৌঁছে যাক। আজ যদি আমরা নীরব থাকি, কাল এই অন্ধকার আপনার-আমার ঘরেও পৌঁছাতে পারে। সমাজকে পরিবর্তন করতে হলে সকলের একসাথে কাজ করে অলাইন জুয়া নির্মূলে ভূমিকা রাখতে হবে।