ঢাকা খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
ফিচার

সিন্ধু জলচুক্তি: শান্তির দলিল নাকি একতরফা ছাড়ের ইতিহাস?

বিশেষ প্রতিনিধি ১৩ মে ২০২৬ ০৫:৫৯ পি.এম

সিন্ধু জলচুক্তিকে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ইতিহাসে প্রায়ই একটি “সফল সমঝোতা” হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু যেকোনো চুক্তির প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে শুধু তার স্থায়িত্ব নয় বরং এর ভেতরের ভারসাম্যও দেখতে হয়। ১৯৬০ সালের এই চুক্তি ছয় দশকের বেশি সময় ধরে টিকে আছে এটি সত্য। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য, শুরু থেকেই এই চুক্তির কাঠামোর মধ্যে ছিল এক ধরনের অসমতা, যার প্রভাব আজও নানা আলোচনায় বারবার ফিরে আসে।

সিন্ধু নদী ব্যবস্থা মূলত ছয়টি প্রধান নদী নিয়ে গঠিত সিন্ধু, ঝিলম, চেনাব, রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু। এই নদীগুলোর পানি শুধু কৃষিকাজের জন্য নয়; পানীয় জল, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের জন্যও অপরিহার্য। দেশভাগের পর এই নদীগুলো দুই রাষ্ট্রের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতা ছিল এমন যে, অধিকাংশ নদীর উজান ভারতের ভূখণ্ডে, আর পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ কৃষিভিত্তিক অঞ্চল ছিল ভাটির পানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে নদী প্রশ্নটি দ্রুতই রাজনৈতিক ও কৌশলগত ইস্যুতে পরিণত হয়।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে পানি নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়। ভারত উজানের দেশ হিসেবে প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণের সুবিধা পেলেও শুরু থেকেই সম্পূর্ণ আধিপত্যের পথে হাঁটেনি। বরং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে। অন্যদিকে পাকিস্তান বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরে এবং ক্রমাগত চাপ তৈরির কৌশল নেয়। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক মধ্যস্থতায় এগিয়ে আসে।

১৯৫৪ সালে বিশ্বব্যাংক যে প্রস্তাব দেয়, সেটিই পরে মূলত সিন্ধু জলচুক্তির ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। প্রস্তাবে বলা হয়, পূর্বাঞ্চলের নদী রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু ভারত ব্যবহার করবে। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলের নদী সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত হবে। এখানেই প্রথম বড় বৈষম্যের প্রশ্ন ওঠে। কারণ পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর প্রবাহ ছিল তুলনামূলক অনেক বেশি।

চুক্তির চূড়ান্ত রূপ স্বাক্ষরিত হয় ১৯৬০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর, করাচিতে। ভারতের পক্ষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, পাকিস্তানের পক্ষে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি এতে স্বাক্ষর করেন। আন্তর্জাতিক মহলে এটিকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু চুক্তির ধারাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলের তিন নদীর পূর্ণ ব্যবহারিক অধিকার ভারত পেলেও পশ্চিমাঞ্চলের তিন নদীর মূল প্রবাহের ওপর অধিকার কার্যত পাকিস্তানের হাতে চলে যায়। হিসাব অনুযায়ী পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর বার্ষিক প্রবাহ ছিল প্রায় ১৩৫ মিলিয়ন একর-ফুট (MAF), আর পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলোর প্রবাহ ছিল প্রায় ৩৩ মিলিয়ন একর-ফুট। অর্থাৎ মোট পানির প্রায় ৮০ শতাংশ পাকিস্তানের অংশে যায়, আর ভারত পায় মাত্র ২০ শতাংশের মতো।

এখানেই বিষয়টি শেষ হয়নি। ভারতকে পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও থাকতে হয়। চেনাব নদী থেকে প্রায় ৩.৬ MAF পানি সরিয়ে নেওয়ার অধিকার ভারতকে ছেড়ে দিতে হয়। মাধোপুর বা ফিরোজপুর হেডওয়ার্কসের মতো গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার প্রশ্নেও ভারতকে নমনীয় অবস্থান নিতে হয়েছে। এমনকি কিছু এলাকায় নতুন সেচ প্রকল্প বা জলউন্নয়ন কার্যক্রমেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে কারিগরি শর্ত। ভারত নিজের ভূখণ্ডে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প করতে পারবে, তবে তার নকশা, পানি সংরক্ষণের ক্ষমতা, এমনকি বাঁধের গঠন নিয়েও নির্দিষ্ট শর্ত মানতে হবে। অর্থাৎ নদী ভারতের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হলেও তার পূর্ণ ব্যবহারিক স্বাধীনতা ভারতের হাতে ছিল না।

আরও বিস্ময়কর বিষয় ছিল আর্থিক ছাড়। চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত পাকিস্তানকে প্রায় ৬২ মিলিয়ন পাউন্ড অর্থ প্রদান করতে সম্মত হয়, যাতে পাকিস্তান বিকল্প খাল ও অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি ছিল এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ এখানে উজানের দেশ শুধু পানির বড় অংশ ছেড়েই দেয়নি, সেই সঙ্গে ভাটির দেশের অবকাঠামো গঠনের জন্যও অর্থ দিয়েছে।

সমর্থকেরা বলেন, এই চুক্তির কারণেই দুই দেশের মধ্যে পূর্ণমাত্রার জলসংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়েছে। ১৯৬৫, ১৯৭১ কিংবা কারগিল সংঘাতের সময়ও সিন্ধু জলচুক্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। এটিকে তারা চুক্তির স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতার প্রমাণ হিসেবে দেখান।

তবে সমালোচকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, চুক্তিটি এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছে যেখানে ভারত নিজের ভূখণ্ডে থাকা নদীগুলোর ওপরও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করতে পারেনি, অথচ পাকিস্তান দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেয়েছে। বিশেষ করে পানি যখন ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হয়ে উঠছে, তখন এই ধরনের একতরফা ছাড় নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

আজ, ছয় দশক পরে এসে সিন্ধু জলচুক্তিকে শুধু “শান্তির প্রতীক” বলে দেখলে হয়তো পুরো বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হলো একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সামরিক বা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় প্রকাশ পায় না বরং অনেক সময় তার সংযম ও দায়িত্ববোধেও প্রকাশ পায়। সিন্ধু জলচুক্তিতে ভারত সেই সংযমেরই পরিচয় দিয়েছিল। উজানের দেশ হয়েও নদীর বড় অংশের ব্যবহারিক সুবিধা ছেড়ে দেওয়া, এমনকি অবকাঠামো নির্মাণে আর্থিক সহায়তা করা ছিল ভারতের বিরল এক কূটনৈতিক উদারতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই উদারতার বিনিময়ে কি সত্যিই দুদেশের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, নাকি সময়ের সঙ্গে সেটি ভারতের একতরফা ছাড় দিয়ে যাওয়ার স্থায়ী কাঠামোয় পরিণত হয়েছে?

আরও খবর

news image

সিন্ধু জলচুক্তি: শান্তির দলিল নাকি একতরফা ছাড়ের ইতিহাস?

news image

তরুণদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্তের ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে

news image

অনাবৃষ্টি প্রখর তাপে মুগডাল চাষিরা বিপাকে কাঙ্ক্ষিত ফলন থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা 

news image

ঈদ: ফিরে আসার অনন্ত গল্প-কৃষিবিদ মোঃ আতিকুর রহমান

news image

ভাষা আন্দোলন ও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের প্রয়োজনীয়তা

news image

সাতক্ষীরায় লবণাক্ততা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়াতে আগাম বোরো চাষ করছে কৃষক

news image

যাদের স্বামী পাশে থেকেও নেই তাদের করনীয়

news image

মাঘের শীতেই মুকুলে ভরেছে দিনাজপুরের আমগাছ

news image

বিলুপ্তির পথে দিনাজপুরের শীতল মাটির ঘর

news image

বাংলাদেশের আকাশছোঁয়া জলবায়ু ঋণ: সহনশীলতা ঝুঁকিতে, দারিদ্র্য বাড়ছে

news image

সর্বজনীন ফর্মূলায় না আসলে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে বাংলাদেশ

news image

দূষিত পরিবেশে বিপন্ন দেশ রক্ষার এখনই সময়

news image

আম ব্যবসায় সাফল্য: বড় উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন সোহাগের 

news image

তামাকমুক্ত দেশ গড়তে সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন

news image

সৌখিন কৃষি ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানবিক সেবা কাজে কুসুমপুর গ্রামবাসীর ভালোবাসায় শিক্ত ভেষজ বিজ্ঞানী বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ টিপু সুলতান পিএইচডি 

news image

প্রযুক্তিগত সুফল কৃষিতে জাগরণ সৃষ্টি করেছে

news image

পথে প্রান্তরে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে জারুল ফুল

news image

হাওরে কান্দা কাটায় গোখাদ্য ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস

news image

দক্ষিনাঞ্চল থেকে হাড়িয়ে যাচ্ছে ফুটপাতে চুলকাটার ঐতিহ্য

news image

জোসেফ মাহতাবের এক বহুমুখী সমাজ সংস্কারকের অন্যতম গল্প

news image

শেরপুরের মাটি সূর্যমুখী চাষে বেশ উপযোগী

news image

আমতলীতে আমের মুকুলের মৌমৌ গন্ধে দল বেঁধে মধু আহরনে ছুটছে মৌমাছি

news image

আমতলী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বেত ও বেতফল

news image

ভবেন্দ্র মোহন সাহা থেকে ভবা পাগলা হয়ে উঠার গল্প

news image

দক্ষিনাঞ্চল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গানের পাখি দোয়েল